1. admin@jamunarbarta.com : যমুনার বার্তা : যমুনার বার্তা
  2. shohel.jugantor@gmail.com : যমুনার বার্তা : যমুনার বার্তা
শনিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২২, ০২:৫৬ পূর্বাহ্ন

অবকাঠামোয় বিপ্লব ॥ নতুন যুগে বাংলাদেশ

  • প্রকাশ শুক্রবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২১
  • ৩৬ জন পঠিত

ভঙ্গুর অর্থনৈতিক দশা নিয়ে একাত্তরে যাত্রা শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ। যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদে বৈষম্যহীন, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু নবগঠিত বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্নের ওপর দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন, তা স্বাধীনতাবিরোধী ও একাত্তরের পরাজিত শক্তির কারণে বঙ্গবন্ধু সমাপ্ত করে যেতে পারেননি। আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। মূলত আশির দশকে দেশের যোগাযোগ খাতে বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণের ধারা শুরু হয়। ৯০ দশকে গ্রামাঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়নে গতি পায়।

গত এক যুগে মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নে অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটেছে বাংলাদেশে। অর্থনীতিতে গতি আনতে দেশের যোগাযোগ ও পরিবহন খাতের উন্নয়নে সরকারের নেয়া বড় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ শেষ হতে যাচ্ছে আগামী বছর। আলোচিত পদ্মা সেতু আগামী জুনের মধ্যে চালু হবে। এর ফলে দেশের আটটি বিভাগই সরাসরি সড়ক যোগাযোগের আওতায় চলে আসবে। ঢাকাবাসী ইতোমধ্যে দেশের প্রথম মেট্রোরেলের পরীক্ষামূলক চলাচল দেখেছে। আগামী বছরের শেষের দিকে এই ট্রেন যাত্রী নিয়ে চলাচল করবে। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণাধীন দেশের প্রথম পাতালপথও (টানেল) চালুর কথা আগামী বছরের শেষে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের আলোচিত এসব অবকাঠামো চালু হলে যোগাযোগ ও পরিবহন খাত নতুন যুগে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ।

তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক বঞ্চনা, শোষণ আর নিপীড়ন থেকে মুক্ত হয়ে শূন্য থেকে শুরু করা বাংলাদেশের বয়স এখন ৫০। পাঁচ দশকে পাকিস্তান তো বটেই সেই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়ও বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়েছে। সমৃদ্ধ হয়েছে অবকাঠামো আর অর্থনীতির গল্পে। আশির দশকে দেশের যোগাযোগ খাতে বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণের ধারা শুরু হয়েছিল। এরপর পল্লী অবকাঠামো উন্নয়নের বিকাশ ঘটে ৯০ দশকের দিকে। সেই সময়ে গ্রাম-গঞ্জ, পাড়া-মহল্লায় যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। গত এক যুগে এই খাতে বিনিয়োগ আরও বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলের মতো ‘আইকনিক’ বা নতুন যুগে প্রবেশের স্মারক অবকাঠামোগুলো চালু হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। সরকার ১০টি বড় প্রকল্পকে অগ্রাধিকারের তালিকায় (ফাস্ট ট্র্যাক) রেখেছে। সেভাবেই এগিয়ে চলছে কাজ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সার্বিকভাবে বাংলাদেশের ভৌত অবকাঠামোতে সন্তোষজনক উন্নয়ন হয়েছে। কেবল এখন নয়, তিন-চার দশক থেকেই গ্রামীণ অবকাঠামো বা রাস্তাঘাটের যথেষ্ট উন্নয়ন হয়েছে, বিশেষ করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) হওয়ার পর। বেশিরভাগ গ্রামেই রাস্তা আছে। অনেক জায়গায় মহাসড়ক আছে। দ্বিতীয়ত, ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, খুলনা অঞ্চলে বড় বড় অবকাঠামোসহ বেশ ভাল উন্নতি হয়েছে। বড় বড় রাস্তা এখন মোটামুটি ভাল।’ রেলের ক্ষেত্রে এখনও সন্তোষজনক উন্নতি হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বহু টাকা ব্যয় হচ্ছে কিন্তু আশানুরূপ হয়নি রেলওয়েটা। আমাদের নৌপথ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং সবচেয়ে বেশি নৌপথ ছিল। বহু আগে নৌপথই ছিল সবচেয়ে সস্তা, গুরুত্বপূর্ণ, আনাচে-কানাচে যাওয়া যেত। এখন সমস্যা হলো নদীর নাব্য, বহু খাল ভরাট করে ফেলেছে। এদিকে আমার মনে হয়, নজর একটু কমই। এটার গুরুত্বও অনেক বেশি। ব্যবসা-বাণিজ্য সবদিকেই।’

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে জাতীয় উন্নয়নে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে আছে পদ্মা সেতু। এটির কাজ শেষ হলে এবং যানবাহন চলাচল শুরু হলে ইস্টার্ন বাংলাদেশ আর ওয়েস্টার্ন বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পৃক্ত হবে। এটার সরাসরি উপকার আছে। প্রতিদিনই ফেরি পারাপার হওয়ার জন্য মানুষের ভোগান্তি হয়। এছাড়া দূরত্ব কমে যাবে। অনেক হিসাবে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু হলে ঢাকার সঙ্গে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার কমে যাওয়ার সমান সময় বাঁচবে। এটা তো একটা বিরাট ব্যাপার।’ তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয়ত হলো- ঢাকার মেট্রোরেল চালু হলে ঢাকাবাসীর গণপরিবহনের বিরাট সমস্যার সমাধান হবে। বলা হচ্ছে যে, প্রতি ঘণ্টায় অনেক যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন। বিষয়টি যদিও ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করবে, তবুও যানজট এখন যা আছে তার চেয়ে কমবে, যদি আমরা সময়মতো চালু করতে পারি। একটা (এমআরটি লাইন-৬ বা উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত) যদি চালু হয়, তাহলে কিন্তু এটা উল্লেখযোগ্য। পুরোটা হলে তো কথাই নেই। তাহলে তো ঢাকার রাস্তার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণের মতো হয়ে যাবে। ঢাকার মতো নগরীতে মোট জমির অন্তত ২৫ শতাংশ সড়ক থাকার কথা, সেখানে আছে পাঁচ শতাংশের মতো। ঢাকার মতো শহরে যদি গণপরিবহনের ব্যবস্থা হয়ে যায় এবং ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখা যায়, তাহলে কিন্তু ঢাকার বোঝা কমবে।’

পদ্মা সেতু ঘিরে তিনটি বিশ্ব রেকর্ড ॥ পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময় আগামী বছরের জুনে। সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচলের জন্য এখন পিচঢালাই চলছে। এরপর আলোকসজ্জার কাজ করতে হবে। এর বাইরে গ্যাস পাইপলাইন বসানোর কাজ চলমান। গত ৩০ নবেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক কাজের অগ্রগতি ৮৯ শতাংশ। এর মধ্যে মূল সেতুর কাজ শেষ হয়েছে ৯৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। পদ্মা সেতু নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয় ২০০৫ সালে। প্রকল্প নেয়া হয় ২০০৭ সালে। ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। কিন্তু নানা জটিলতায় সাত বছর পর মূল সেতুর কাজ শুরু হয় ২০১৪ সালে। চার বছরের সময়সীমা ধরা ছিল। কিন্তু সময়মতো বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এখন পর্যন্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। সময়মতো কাজ না হওয়ার পেছনে পদ্মা নদীর অননুমেয় রূপ, বন্যায় ভাঙ্গন, করোনা পরিস্থিতিকে দায়ী করা হয়। গত বছরের ডিসেম্বরে সেতুর সর্বশেষ স্টিলের কাঠামো বা স্প্যান বসানোর পর মূলত কারিগরিভাবে জটিল কাজ শেষ হয়। যুক্ত হয় মুন্সীগঞ্জের মাওয়া এবং শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্ত। প্রকল্পের কাজের জটিল প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলতে গিয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, এই সেতু ঘিরে তিনটি বিশ্ব রেকর্ড হয়েছে। পদ্মা সেতুর খুঁটির নিচে সর্বোচ্চ ১২২ মিটার গভীরে স্টিলের পাইল বসানো হয়েছে। এসব পাইল তিন মিটার ব্যাসার্ধের। বিশ্বে এখনও পর্যন্ত কোন সেতুর জন্য এত গভীরে পাইলিং প্রয়োজন হয়নি এবং মোটা পাইল বসানো হয়নি। ভূমিকম্প থেকে রক্ষা পেতে এই সেতুতে ‘ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিংয়ের’ সক্ষমতা হচ্ছে ১০ হাজার টন। এখন পর্যন্ত কোন সেতুতে এমন সক্ষমতার বিয়ারিং লাগানো হয়নি। রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে টিকে থাকার মতো করে পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে।

সমীক্ষায় এসেছে, এই সেতু দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯ জেলাকে ঢাকাসহ সারাদেশের সঙ্গে যুক্ত করবে। সেতুটি চালু হলে দেশের জিডিপির হার বাড়াবে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বাড়াবে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে প্রতিবছর কী পরিমাণ যানবাহন চলাচল করবে, তা নিয়ে ২০০৯ সালে একটি বিস্তারিত সমীক্ষা করে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এতে দেখা যায়, ২০২২ সালের শুরুতে যদি পদ্মা সেতু উদ্বোধন হয়, তাহলে ওই বছর প্রতিদিন সেতু দিয়ে চলাচল করবে প্রায় ২৪ হাজার যানবাহন। ২০৫০ সালে যা দাঁড়াবে প্রায় ৬৭ হাজার। সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পদ্মা সেতু চালু হলে পণ্যবাহী যানবাহনের একটা বড় অংশ হবে ভারতের। দেশটির পশ্চিমাংশ থেকে পূর্বাংশে মাল পরিবহন হবে এই পথে। নেপাল ও ভুটানকেও সেতুটি যুক্ত করতে পারবে। এতে আন্তঃবাণিজ্য বাড়বে। পদ্মা সেতু চালুর পর এর পূর্ণ সদ্ব্যবহার এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গত এক দশকে বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত রেললাইন বসাতে ৩৯ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প চলমান আছে। ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত সেতুর দুই প্রান্তে ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ শেষ হয়েছে। সেতু চালু হলে সড়কপথে এই পথ পাড়ি দিতে ১ ঘণ্টা লাগবে বলে সরকার জানিয়েছে। এখন ফেরিতে পদ্মা পার হতেই ২-৩ ঘণ্টা লাগে।

উড়ালপথে মেট্রোরেল দেখেছে ঢাকাবাসী ॥ রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দেশের প্রথম মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পের কাজের সার্বিক অগ্রগতি ৭২.৯৯ শতাংশ। এই প্রকল্প দুই পর্বে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মধ্যে উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশ আগামী বছরের ডিসেম্বরে চালু করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এই অংশে ভৌত কাজের অগ্রগতি ৮৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এই পথে চলাচলের জন্য কেনা ছয় সেট ট্রেন (এক সেটে ছয়টি কোচ) জাপান থেকে বাংলাদেশে এসেছে। ইতোমধ্যে এই ট্রেনের পরীক্ষামূলক (পারফর্মেন্স টেস্ট) চলাচল শুরু হয়েছে, যা চলবে ছয় মাস। এরপর তিন মাস ধরে চলবে সমন্বিত পরীক্ষামূলক (ইন্টিগ্রেটেড টেস্ট) চলাচল। পরের পাঁচ মাসে চূড়ান্ত পরীক্ষামূলক চলাচল (ট্রায়াল রান) সম্পন্ন হবে। অর্থাৎ আগামী বছরের ডিসেম্বরে যাত্রী নিয়ে চলাচলের জন্য প্রস্তুত থাকবে ট্রেন। ২০১৮ সালে বুয়েটের করা এক সমীক্ষায় এসেছে, রাজধানীতে যানবাহনের ঘণ্টায় গতিবেগ গড়ে ৫ কিলোমিটার। অর্থাৎ হাঁটা গতি। ১২ বছর আগেও এই গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকার ফলে যাত্রীদের মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। এই চাপ আবার কাজ করছে অন্যান্য রোগের উৎস হিসেবে। যানজটের কারণে শুধু ঢাকায় দৈনিক ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যার আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এই পরিস্থিতিতে ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকায় তিনটি, ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি পথে মেট্রোরেল চালুর সুপারিশ করা হয়েছিল। এর মধ্যে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত পথটির নাম এমআরটি লাইন-৬। যার কাজ চলমান। বাকি পথগুলোর নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড।

পানির নিচে কর্মযজ্ঞ ॥ কর্ণফুলী নদী চট্টগ্রাম শহরকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। এক ভাগে রয়েছে নগর ও বন্দর এবং অন্য ভাগে রয়েছে ভারি শিল্প এলাকা। কর্ণফুলী নদীর ওপর ইতোমধ্যে তিনটি সেতু নির্মিত হয়েছে। তবে তা যানবাহনের চাপ সামলাতে যথেষ্ট নয়। এর বাইরে কক্সবাজার পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, একে ঘিরে পর্যটন বাড়ছে। এর মধ্যে মহেশখালীতে গভীর সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে। মাতারবাড়িতে চলছে গভীর সমুদ্রবন্দর ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণকাজ। সব মিলিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা আছে। চট্টগ্রামে বে-টার্মিনাল হবে। কর্ণফুলী নদীর এই দুই পাড়ের কর্মযজ্ঞ বিবেচনায় নিয়ে নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের প্রকল্প নেয়া হয়, যা চট্টগ্রাম শহর ও আনোয়ারা উপজেলাকে যুক্ত করবে। ২০১৪ সালে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ও চীনের সরকারী পর্যায়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়। নক্সা ও অন্যান্য কাজ শেষে ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি টানেলের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ব্যয় হচ্ছে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। নির্মাণাধীন দেশের প্রথম টানেলের নামকরণ করা হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে। এটি দিয়ে যান চলাচল শুরু হলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামগামী যানবাহনকে আর চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করতে হবে না। সিটি আউটার রিং রোড হয়ে টানেলের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে। এতে চট্টগ্রাম শহরে যানবাহনের চাপ কমে যাবে। কর্ণফুলী টানেলের কাজের অগ্রগতি ৭৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এই টানেলটিতে দুটি টিউবের মাধ্যমে আসা-যাওয়ার পথ আলাদা থাকবে। ইতোমধ্যে একটি টিউবের কাজ শেষ হয়েছে। অন্যটির কাজ চলমান আছে। চুক্তি অনুসারে, আগামী ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এর মধ্যেই কাজটি শেষ করা যাবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন।

পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের যুগে বাংলাদেশ ॥ সেই ষাটের দশক থেকে দেশের মানুষ পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের কথা শুনে এলেও বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের যুগে প্রবেশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে ২০১০ সালে। পাবনার ঈশ্বরদীতে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুত কেন্দ্রটির উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে ২০২৪ সালে। এছাড়া কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলা মাতারবাড়িতে চলছে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুত প্রকল্প নির্মাণের কাজ। এছাড়া শিল্পাঞ্চল এবং সমুদ্রবন্দর ঘিরে আরও তৈরি হচ্ছে বিদ্যুত কেন্দ্র, তেল সংরক্ষণাগার, বিদেশ থেকে আমদানি করা প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), কয়লা, তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) খালাসের টার্মিনালসহ ৬৮টি প্রকল্প। এসব কাজে ব্যয় হতে পারে ৫৬ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পগুলোর মধ্যে বিদ্যুত বিভাগের ২৩টি, জ্বালানি বিভাগের ছয়টি, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) প্রকল্প দুটি, নৌ মন্ত্রণালয়ের ৯টি, সড়ক ও সেতু বিভাগের আটটি, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ৯টি করে প্রকল্প। এসব প্রকল্পের মধ্যে প্রধান হলো দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর, যা গড়ে উঠছে মাতারবাড়িতে। গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুত-জ্বালানির একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকা। সরকার আশা করছে, মহেশখালী ঘিরে চলমান কর্মকা- শেষ হলে দেশের অর্থনীতির চেহারা পাল্টে যাবে।

সড়ক ও যোগাযোগ ॥ অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে। ১৯২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রকল্পটির কাজ শুরু হলেও দফায় দফায় সময় বাড়ছিল। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনায় চীনা কোম্পানি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনের কাজ শেষ করে। যার ফলে মানুষ এখন কম সময়ে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন করতে পারছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেন সড়ক পাল্টে দিয়েছে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও শেরপুরের যোগাযোগ ব্যবস্থা। বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি, পায়রা নদীর ওপর পায়রা সেতু, ওয়েস্টার্ন বাংলাদেশ ব্রিজ ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেন্ট, ক্রস-বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট, সাসেক সংযোগ সড়ক-২, এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ ও ঢাকা-খুলনা (এন-৮) মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী ইন্টারসেকশন থেকে (ইকুরিয়া-বাবুবাজার লিংক সড়কসহ) মাওয়া পর্যন্ত মহাসড়ক, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ পাল্টে দিয়েছে মানুষের জীবনধারা। ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যেতে আধুনিক, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। গত ১০ বছরের হিসাবে দেখা গেছে, জনগণের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে স্বস্তি আনতে ২৭৬ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। নতুন করে আরও ৩৪১টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ এক হাজার ১৪০ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রশস্তকরণ ও জেলা মহাসড়ক যথাযথ মানে উন্নীতকরণ গুচ্ছ প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত আট হাজার ৭০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে র‌্যাম্পসহ ৪৬.৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি প্রকল্পের কাজ চলছে।

রেলপথ ॥ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম গুরুত্ব দেয় দীর্ঘদিনের অবহেলিত রেলপথের ওপর। ভারতের ঋণে আনা হয়েছে ইঞ্জিন, কোচ। নির্মাণ করা হয়েছে নতুন রেলপথ। রেলপথ উন্নয়নে ২০১৬-২০৪৫ মেয়াদে পাঁচ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০ বছর মেয়াদী মাস্টার প্ল্যান নেয়া হয়েছে। রেলপথ সম্প্রসারণ, নতুন রেলপথ নির্মাণ ও সংস্কার, রেলপথকে ডুয়েল গেজে রূপান্তর, নতুন ও বন্ধ রেলস্টেশন চালু করা, নতুন ট্রেন চালু ও ট্রেনের সার্ভিস বৃদ্ধি করা এবং ট্রেনের কোচ সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। আগামী ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ৯০০ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ ডাবল রেল ট্র্যাক নির্মাণ, এক হাজার ৫৮১ কিলোমিটার নতুন রেল ট্র্যাক নির্মাণ, এক হাজার ৫২৭ কিলোমিটার রেল ট্র্যাক পুনর্বাসন, ৩১টি লোকোমোটিভ সংগ্রহ, ১০০টি যাত্রীবাহী কোচ পুনর্বাসন এবং ২২২টি স্টেশনের সিগন্যালিং ব্যবস্থার মানোন্নয়নের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। কুমিল্লা বা লাকসাম হয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ডাবল ট্র্যাক দ্রুতগতির রেললাইন নির্মাণ, ভাঙ্গা জংশন (ফরিদপুর) থেকে বরিশাল হয়ে পায়রা বন্দর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ, নাভারন থেকে সাতক্ষীরা পর্যন্ত এবং সাতক্ষীরা থেকে মুন্সীগঞ্জ পর্যন্ত ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণ এবং ঢাকা শহরের চারদিকে বৃত্তাকার রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এছাড়া মিয়ানমারের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে দোহাজারী-রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু-মিয়ানমারের কাছে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প শুরু হয় ২০১০ সালের জুলাই মাসে। ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটির অগ্রগতি ৬১ শতাংশ। রেলপথ সৃষ্টিতে মাটি ভরাট শেষ করে এখন চলছে লাইন স্থাপনের কাজ। সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পের অন্যতম এই প্রকল্পের শ্রমিকরা প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা কাজ করছেন। ফলে দোহাজারী-কক্সবাজার ১০০ কিলোমিটার রেলপথের বাস্তবায়ন কাজ এখন দৃশ্যমান।

নৌপথ ॥ ২০০১ হতে ২০০৮ অর্থবছর পর্যন্ত মোংলা বন্দর নানামুখী প্রতিকূলতার কারণে লোকসানী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। বন্দরের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের ফলে ২০০৯ সাল থেকে ঘুরে দাঁড়ায় মোংলা বন্দর। শুধু নদীমাতৃক দেশ হিসেবে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের ক্ষেত্রে নৌপথকে গুরুত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। নৌদুর্ঘটনা হ্রাস ও নৌনিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি নৌপথের নাব্য বৃদ্ধি, নৌবন্দরগুলোর উন্নয়ন ও সমন্বিত ড্রেজিং কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সরকার। ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথের মধ্যে ২০ হাজার ৪০০ কিলোমিটার হারিয়ে গেছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৩টি নৌপথ খননের কাজ চলছে। এক হাজার ২৭০ কিলোমিটার উদ্ধার ও প্রায় তিন হাজার একর জমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। নদীর তীরে ভূমি দখলমুক্ত রাখতে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে ব্যাংক প্রটেকশনসহ ২০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। আরও ৫০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। অভ্যন্তরীণ নৌপথের ৫৩টি রুটে ক্যাপিটাল ড্রেজিং ও অন্যান্য নাব্য উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর পণ্য হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীতকরার লক্ষ্যে নতুন কনটেইনার টার্মিনাল, ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড, বে-টার্মিনাল, বাল্ক টার্মিনাল নির্মাণ ও জলযান সংগ্রহের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

আকাশপথের উন্নয়ন ॥ দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর যাত্রী ও কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতার মান এবং পরিধি বৃদ্ধির অংশ হিসেবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণকাজ চলমান। কক্সবাজার ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীতকরার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। বাগেরহাট জেলায় খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণসহ যশোর, সৈয়দপুর ও বরিশাল বিমানবন্দর এবং রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ ও নবরূপায়ণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের কাজ চলছে জোরেশোরে। ২৭ হাজার বর্গমিটার এলাকা নিয়ে তৈরি হচ্ছে আমদানি কার্গো টার্মিনাল। পাইলিংয়ের কাজ শেষ। এখন চলছে গ্রাউন্ডের কাজ। টার্মিনালের পাশাপাশি দুটি হাইস্পিড ট্যাক্সিওয়ে তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া পণ্য আমদানি ও রফতানির জন্য দুটি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। আরও থাকবে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য তিনতলা ভবন। সব মিলিয়ে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে চলছে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। প্রকল্প পরিচালক মাকসুদুল ইসলাম জানান, বিদেশ থেকে একজন যাত্রী হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমেই যাতে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভাল ধারণা পান, তৃতীয় টার্মিনালটি সেভাবেই তৈরি করা হচ্ছে। সব ধরনের সুবিধা থাকবে এ টার্মিনালে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই বিভাগের আরো বার্তা দেখুন
©২০১৫ ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
Theme Customized By BreakingNews